আজ চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের প্রয়াণদিবস

গ্রামীণ সাংবাদিকতার মহান পথিকৃৎ একুশে পদকপ্রাপ্ত চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের আজ প্রয়াণদিবস। তাঁকে নিয়ে আমার স্মৃতিচারণের পাশাপাশি মোনাজাতউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জনাব হাসান মীরের একটি পুরনো লেখা এখানে জুড়ে দিলাম। জনাব আনওয়ারুল ইসলাম রাজুর একটি লেখাও এখানে জুড়ে না দিয়ে পারলাম না। বলা যায়, মোনাজাতউদ্দিনকে নিয়ে এটি একটি যৌথ প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি আকারে বড় হলো। যাঁরা মোনাজাতউদ্দিনকে ভালোবাসেন তাঁরা শেষ পর্যন্ত পড়বেন বলে আমরা আশা করি।


মোনাজাতউদ্দিন : দূরত্বে মাত্র এক নিশ্বাস।
আলী আখতার গোলাম কিবরিয়া

আজ ২৯শে ডিসেম্বর। চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের প্রয়াণদিবস। এই কিংবদন্তী সাংবাদিক খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ১৯৯৫’র এদিনে যমুনায় প্রাণ হারান। আমার দীক্ষাগুরু মোনাজাতউদ্দিনকে নিয়ে স্মৃতি চর্চা করা আমার জন্য বেশ কঠিন। কঠিন একটি কারণে যে, লিখতে গিয়ে কোনোভাবে যদি মোনাজাতউদ্দিন কোথাও খাটো হয়ে যান তাহলে জনতার আদালতে আমার অপরাধ হবে ক্ষমার অযোগ্য। ভয় সেখানেই। তাছাড়া স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার জন্য ধারাবাহিকভাবে ওঁকে নিয়ে লেখা আমার জন্য কোনোভাবেও সম্ভব নয়। তবুও টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি একখানে করে দেখা যাক, মোনাজাতভাইকে কতটুকু স্মরণ করা যায়!

আমি তখন কারমাইকেল কলেজে অনার্সে পড়ি। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ। শুনলাম, রংপুরের স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা মহাকাল দৈনিকে পরিণত হতে যাচ্ছে এবং সেজন্য সাংবাদিকতায় আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মহাকালের বার্তা সম্পাদক জনাব মাহবুবুল ইসলাম সেসময় রংপুরের একজন দাপুটে সাংবাদিক। কবিতা লেখেন অসাধারণ। অভিযাত্রিক সাহিত্য সংগঠনের অন্যতম কর্ণধারও তিনি। কীভাবে মাহবুব ভাইয়ের সঙ্গে আমার আন্তরিকতা গড়ে উঠেছিল তা আজ আর মনে করতে পারছি না। লেখালিখিতে ঝোঁক থাকার কারণে মাহবুব ভাইয়ের প্রেরণায় ভাবলাম, মহাকাল আয়োজিত সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিতে পারলে মন্দ কী! রংপুরের প্রথম দৈনিকে জায়গা পেলে ভবিষতে কাজে লাগবে।

সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু হলো মহাকাল অফিসের দোতলায়। মাহবুব ভাই সহ প্রশিক্ষক অনেকেই ছিলেন। তবে দৈনিক সংবাদের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি মোনাজাতউদ্দিন যে প্রশিক্ষকের পাশাপাশি সংগঠকের ভূমিকা পালন করতেন তা বোঝা যেতো। কারমাইকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র সহ আমরা জনা তিরিশেক ওই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলাম। প্রশিক্ষণের ব্যাবহারিক দিকটি মোনাজাতউদ্দিন সামলাতেন। সেনপাড়ার জনৈক টুনু চৌধুরী গাভী পালনে কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রপতির পদক পেয়েছিলেন সেসময়। প্রশিক্ষণার্থীরা সবাই গাভী দেখতে গেলাম ওই বাড়িতে। আপ্যায়নও হলো। এরপর ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। মোনাজাতভাই আমাকে শিখিয়ে দিলেন, কিবরিয়া, প্রশ্ন করো, ’আপনি কি দুধে পানি মেশান?’ অবাকই হলাম এজন্য যে, দুধে পানি মেশার কথা জনসমুদ্রে কে স্বীকার করবেন! এ ধরনের আজগুবি প্রশ্ন করলে সহকর্মীরা আমাকে বোকা ভাবতে পারেন। প্রশ্ন না করে তাকালাম মোনাজাতউদ্দিনের দিকে। মোনাজাতভাই ঘাড় নেড়ে এক কাব্যিক ভঙ্গিতে আমাকে জানান দিলেন যে, প্রশ্নটা এক্ষুনি করো। প্রশ্ন করলাম। ’না’ উত্তর এলো। সঙ্গে সঙ্গে মোনাজাতভাই শিখিয়ে দিলেন উল্টো আর এক প্রশ্ন। প্রশ্নটি ছিল, ’কেন আপনি দুধে পানি মেশান না?’ অনেক পরে বুঝেছি, দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরের মধ্য দিয়ে দেশের প্রতি ওই গাভীওয়ালার মনোভাব যাচাই করা সম্ভব হয়েছিল।

সরাসরি সাগরেদ হওয়ার আগেই বুঝতে পেরেছিলাম সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন খবরের গভীর থেকে গভীরে যেতে পছন্দ করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সফরসঙ্গী হিসেবে বিদেশ যাওয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে মোনাজাতভাই আমাকে বলেছিলেন, প্যান্টের ভেতরে গামছা পেঁচিয়ে ভদ্রলোক সেজেছিলাম। কারণ হারুন হাবিবের ধার করা ফুলপ্যান্ট লম্বায় ঠিক হলেও কোমর ছিল অনেক বেশি ঢিলেঢালা। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, গামছা না পেঁচালে তো প্যান্ট খুলে পড়তো। সাজগোছ দেখে কি আর ভদ্রলোকের আসল চেহারা বোঝা যায়? আমার মতো ভদ্রলোকরা এরকমই হয়। কী বলো?

এরপর মহাকাল দৈনিক দাবানলে রূপ পেলো। প্রকাশিত হলো দৈনিক দাবানল। দাবানলে চারজন স্টাফ রিপোর্টার নেয়া হলো। লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হওয়া ওই চারজনের মধ্যে আমি একজন। প্রথম দুই-আড়াই বছর ওখানে কাজ করার পর দাবানল ছেড়ে দিই। অনেক কিছু শিখেছিলাম মাহবুব ভাইয়ের কাছে। আমার প্রথম দীক্ষাগুরু মাহবুব ভাই। প্রণতি জানাই জনাব মাহবুবুল ইসলামকে।

এরই মধ্যে মোনাজাত ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্টতা তৈরি হলো। কীভাবে হলো কখন হলো এসবের উত্তর দেয়া এখন আর সহজ নয়। শুরু হলো এক সঙ্গে পথ চলা অর্থাৎ ওঁর পেছন-পেছন হাঁটা। মোনাজাতভাইয়ের ব্যাগটা আমার ঘাড়েই থাকতো বেশিরভাগ। মোনাজাতউদ্দিনের গুরু ছিলেন সাংবাদিক আব্দুল মজিদ। কাজ করতেন দৈনিক বাংলায়। দেখেছি, মোনাজাতভাই মজিদ ভাইকে বেশ ডর করে চলতেন। মোনাজাতভাইয়ের খবর জানতে মজিদ ভাই আমাকে প্রশ্ন করতেন এভাবে, ’কিরে কিবরিয়া, পাগলাটা কোথায়?’ ইত্তেফাকের খোকা ভাই, অবজারভারের মোজাম্মেল ভাই, জনতার ছালাম ভাই, বার্তার সাত্তার ভাই, টাইমসের আব্দুস শাহেদ মন্টু ভাই ছিলেন রংপুরের তখনকার সিনিয়র সাংবাদিক। মোনাজাতভাই ওঁদের সম্মান করে চলতেন। মজিদ ভাইয়েরা আজ অনেকেই নেই, আছেন একমাত্র মন্টু ভাই।

মজিদ ভাই রাগী স্বভাবের ছিলেন । একটি দৃশ্য মনে পড়ে খুব। মোনাজাতভাই ‘জহুর হোসেন চৌধুরী স্মৃতি স্বর্ণপদক’ পেয়েছেন। দু’দিন পর ঢাকা থেকে ফিরলেন। রংপুর প্রেসক্লাবের পাশে ’রুচিতা’ নামের একটি মাঝারি গোছের চায়ের দোকান ছিল তখন। মজিদ ভাই চায়ের পর সিগারেট টানছিলেন। আমি কাছাকাছি টেবিলে ছিলাম। ভয়ে কথা বলিনি। হঠাৎ মোনাজাতভাই রুচিতায় ঢুকে আমাকে বললেন, ’কিবরিয়া এই কিবরিয়া, আমি পদক পেয়েছি জানো তো?’ উত্তর শুনতে না চেয়ে একনিশ্বাসে প্রশ্ন করলেন, মজিদ ভাইকে দেখেছ? আমি ইশারায় ভেতরের এককোণের টেবিলে মজিদ ভাইকে দেখিয়ে দিলাম। মজিদ ভাই মোনাজাতভাইয়ের দিকে নির্বিকার তাকিয়ে আছেন। মোনাজাতউদ্দিন ছুটে গিয়ে স্মৃতির পদকটি মজিদ ভাইয়ের গলায় পরিয়ে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পা দুটো জড়িয়ে ধরে বললেন, ’মজিদ ভাই এ পদক আমার নয়, এটা আপনার।’ চায়ের দোকানের সকলে দৃশ্যটি উপভোগ করছিলেন তখন। মজিদ ভাই মোনাজাতউদ্দিনের মাথায় হাত বুলাচ্ছেন। টপটপ করে মজিদ ভাইয়ের চোখ দিয়ে জল পড়ছে আর মোনাজাতউদ্দিন মজিদ ভাইয়ের হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছেন। গুরু শিষ্যের এমন মধুর মিলন আমার জীবনে সেটাই প্রথম দেখা।

রিক্সায় চেপে দু’জনে ওনার বাসায় ধাপে ফিরছি। আসতে আসতে মোনাজাতভাই স্মৃতিপদক হস্তান্তর অনুষ্ঠানের বর্ণনা আমাকে শোনাচ্ছিলেন। বক্তৃতা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় মঞ্চে বসা সংবাদ-সম্পাদক আহমেদুল কবির পাশের মোনাজাতউদ্দিনকে সেদিনও ’ইডিয়ট’ বলেছিলেন। এক গাল হেসে বললেন, জানো, কবির ভাইয়ের ‘ইডিয়ট’ বলার একটা বাতিক আছে। সম্ভবত ওই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন দেশের খ্যাতিমান উচ্চারণ বিশেষজ্ঞ আশরাফুল আলম।

আমাদের দু’জনের কাণ্ড দেখে ইতি ভাবী মাঝে মাঝে হাসতেন। রেগেও যেতেন কখনও কখনও। বলতেন, ’কিবরিয়াকে এত বকাবকি কেন করো? ও তো ছাত্র মানুষ। সব কাজ তোমার বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে ও করতে পারবে তেমনটা ভাবো কেন?’ মোনাজাতভাই চুপ করে থাকতেন। বলতেন, ইতি, তুমি ঠিকই বলেছ। মোনাজাতউদ্দিন ওঁর স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন। খুব আদর করতেন সুবর্ণ, চৈতি ও সিথিকে। ছেলেমেয়েদের ডাকতেন আব্বু আর আম্মু বলে। মোনাজাতভাই ভাত দ্রুত খেতেন। বলতাম, এত দ্রুত খান কী করে? উত্তর আসতো, জানো না আমার শরীরে এনজাইম বেশি, গিললেই হজম! এরপর এনজাইম সম্পর্কে প্রশ্ন করার ইচ্ছা থাকলেও সাহস হয়নি আমার।

দুপুরে খাওয়ার পর ওঁকে কখনও বিছানায় যেতে দেখিনি। ঘন ঘন পান খেলেও বাসায় পানের ব্যবস্থা থাকতো না। কাছে থাকলে আমাকে বলতেন, যাও, দৌড় দিয়ে লালকুঠির ওই দোকান থেকে আমার কথা বলে চার-পাঁচটা পান বেঁধে আনো। উনি খয়ের-জর্দা দিয়ে পান খেতেন আর মুষ্টিবদ্ধ হাতে গোল্ডলিফ সিগারেট টানতেন বেশ লম্বা করে। বারান্দায় বসতেন মোড়ায় আর লিখতেন চেয়ারে রেখে। মোনাজাতউদ্দিন এক টানে লিখতেন নিউজপ্রিন্ট প্যাডে। কোনদিনও খসড়া করতে দেখিনি। আমাকে একটা একটা করে পাতা দিতেন পড়তে আর বলতেন বানান দেখতে। তারপর ব্লেড দিয়ে ছবি কেটে সাইজ করতেন। পিন, গাম, খাম ইত্যাদি ব্যাগেই থাকতো। দু’তিনটা আইটেম এক টানে লিখে ফেলতেন। লেখার পর সেগুলো খামে ভরতে হতো আমাকে। খামের ওপর প্রাপকের জায়গায় লিখতেন জনাব মোজাম্মেল হোসেন মন্টু বা শ্রদ্ধেয় সন্তোষ গুপ্ত ইত্যাদি। সন্ধ্যার দিকে দু’জনে আসতাম রংপুরের প্রধান ডাকঘরে। খামগুলো সংবাদে পোস্ট করার পর ফ্রেশ চেহারার মোনাজাতউদ্দিনের আড্ডা চলতো রাত নয়-দশটা পর্যন্ত বিভিন্ন জনের সঙ্গে। মাঝেমধ্যে ডিসি-এসপিদের সঙ্গে তাস খেলতে স্টেশন ক্লাবে যেতেন। আমাকে সাবধান করে দিতেন যেন তাস খেলার কথা ভাবীকে ঘুণাক্ষরেও না বলি। তাস খেলা মোনাজাতভাইয়ের বাহানা মাত্র। তিনি ওখান থেকে খবরের সূত্র খুঁজে নিতেন।

একদিন বললেন, আমাকেও ওনার মত জিন্সের প্যান্ট আর নেভি-ব্লু শার্ট সবসময় পরতে হবে। যখন কথা তখনই কাজ। মালদহ হোটেলের পেছনে এক টেইলরের কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন মোনাজাতভাই। প্যান্ট আর শার্টের কাপড় ওঁর টাকায় কেনা হলো এবং মাপজোখও দেখিয়ে দিলেন তিনি। তখন থেকে ওই ড্রেসে আমি থেকেছি ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। ইতি ভাবী হাসতে হাসতে একদিন আমাকে বললেন, তোমরা দুই ভাই দেখতে তো প্রায় একই রকম। তার ওপর বানালে একই ড্রেস। মাথায় দু’জনেরই ঝাঁকড়া চুল (২০০৫ সালের পর আমার মাথায় আর চুল নেই)। বলতেন, কে যে মোনাজাতউদ্দিন দূর থেকে চিনতে ভুল হয়ে যায়।

আমার অনার্স রেজাল্ট বেরোনোর পর চিৎকার করে ইতি ভাবীকে মোনাজাতভাই বলছিলেন, ’ইতি ও ইতি, শুনেছ, আরে আমাদের কিবরিয়া অনার্স পাস করে ফেলেছে।’ এরপর মাস্টার্স করতে রাজশাহী গেলাম ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে। কিছুটা ছেদ ঘটলো। আমি তখন রাজশাহী বেতারেও খবর পড়তাম। কাজীহাটার ওই বেতার কেন্দ্রে মাসেঅন্তে মোনাজাতভাইয়ের সঙ্গে দেখা হতো। উনি রাজশাহী গেলে উঠতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংবাদপ্রতিনিধি মলয় ভৌমিকের বাসায়, বেশির ভাগ উঠতেন মোনাজাতভাইয়ের ঘনিষ্ট বন্ধু বেতারনিউজের কর্মকর্তা জনাব হাসান মীরের বাসায়। হাসান মীর সাহেবের সঙ্গে বার্তা সংস্থায় আসতেন মোনাজাতউদ্দিন। বার্তা সংস্থার টেবিলে বসে খবর লিখতেন একটার পর একটা। সে আমলে ছবি প্রিন্টের ঝামেলা ছিল। মোনাজাতভাই স্টুডিওর ডার্ক রুমে ঢুকে নিজেই ছবি প্রিন্ট করতেন। অথবা যিনি প্রিন্ট করতেন তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে নির্দেশনা দিতেন। রংপুরে ছবি প্রিন্ট করতেন সোনালী ব্যাংকের সামনের ’বোস স্টুডিও’তে। বোস স্টুডিওর ডার্ক রুমে মোনাজাতভাইয়ের পাশে থেকে বহুদিন ছবি প্রিন্ট করার কাজ দেখেছি আমি। নিউজের পেছনে থাকলে উনি নাওয়াখাওয়া ভুলে যেতেন। ডার্ক রুমে ঢুকলে বের হতেন তিন-চার ঘন্টা পর। দেখা যেতো প্রায়দিন সন্ধ্যা হয়ে গেছে, দুপুরের খাওয়াই হয়নি।

১৯৯২ সালে বিয়ে হওয়ার পর সস্ত্রীক গেলাম মোনাজাতভাইয়ের বাসায় একদিন। কল্পনাকে ইশারা করলাম সালাম করতে। মোনাজাতভাই কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। আমি ওঁর হাত দুটো চেপে ধরলাম। পা ছুঁয়ে ছালাম করার সুযোগ পেলো কল্পনা। তারপর একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি। ভাবী আমাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ’আমার বাসা থাকতে বউ নিয়ে উঠেছ কোথায়?’ এই তো সেদিন, মাসখানেক আগে, ভাবীকে ফোন করলাম ঢাকায়। কথার এক ফাঁকে ভাবী বললেন, ’জানো কিবরিয়া, তোমার ভাই আমাকে একদিন বলেছিল, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আমাকে মেডিকেলে নিতে হলে কাউকে বলো না, শুধু কিবরিয়াকে বলো। ও-ই সব ব্যবস্থা করবে।’ বললাম, কই, একথা তো মোনাজাতভাই থাকতে আমাকে কখনও বলেননি আপনি? ভাবী বললেন, আরে পাগল, তুমি তো তোমার ভাইয়ের সঙ্গে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেবিনেই ছিলে।

স্মৃতিশক্তি বড় দূর্বল হয়ে গেছে । সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। কিছু মনে আসে কিছু আসে না। বুঝতে পারি, স্মৃতিচারণ করা খুব শক্ত কাজ। মোনাজাতউদ্দিনের সঙ্গে কত জায়গায় গেছি, থেকেছি, শিখেছি সেসব আর তেমন নিখুঁতভাবে স্মৃতিতে আসে না। বুঝতে পারছি, কিংবদন্তী সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনকে নিয়ে স্মৃতিচারণ সম্পন্ন করা আমার পক্ষে কোনদিনই সম্ভব হবে না। আমি অক্ষম। ক্ষমা চাই।

মোনাজাতভাই মালেকা বেগমকে বলে সচিত্র সন্ধানীতে আমার কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। অনেকদিন কাজ করেছি সেখানে। সন্ধানীতে একটি প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর আমাকে ফোনে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন মালেকা আপা। লেখাটি ছিল ’উত্তরাঞ্চলের বিচিত্র স্বাদের খাবার’ শিরোনামে। প্যালকা-শোলকা বানানোর বেশ মজাদার বর্ণনা ছিল লেখাটিতে। এতোদিন কাউকে বলিনি। আজ বলি। ওই লেখাটি রুচিতায় বসে লিখেছিলেন মোনাজাতউদ্দিন। আমার নামটিও উনি লিখে দিয়েছিলেন। ওই লেখায় আমার কোন স্পর্শই ছিল না। সন্ধানীতে আমার পরিবেশিত সিরাজগঞ্জের তাঁতের ওপর অন্য আর একটি লেখা দেখে বেজায় খুশি হয়েছিলেন মোনাজাতভাই। সিরাজগঞ্জের তাঁতের ওপর ওই লেখাটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেছিল সচিত্র সন্ধানী। প্রতিবেদনটি পড়ে মোনাজাতউদ্দিন কিছুটা মন খারাপ করেছিলেন আমার ওপর। প্রতিবেদনের এক জায়গায় লিখেছিলাম, ’নতুন গোপালপুর গ্রামে তাঁতের দিনরাত কর্কশ শব্দ’। মোনাজাতউদ্দিন বলেছিলেন, শব্দচয়নের মধ্য দিয়ে শিল্পের মাধুর্য তুলে ধরতে হয়। তাঁতের খটখট-খটাখট খটখট-খটাখট শব্দের ভেতর কী যে অপূর্ব কাব্যময়তা রয়েছে একবার ভাবো। আর তুমি সেখানে লিখলে ’কর্কশ’? এটা অন্যায় করেছ কিবরিয়া।

সম্ভবত ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। খবরের সন্ধানে আমার গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটের বড়খাতায় এসে দশ দিন ছিলেন সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দদিন। উনি আর আমি একবিছানায় থাকতাম। মোনাজাতভাইয়ের কিছু শিশুসুলভ আচরণ ছিল। যেমন- রাতে ঘুম থেকে ডেকে আমাকে বলতেন ’কিবরিয়া আমার ভয় লাগছে খুব। তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরো তো।’ আমি মোনাজাতভাইকে জড়িয়ে ধরতাম আর উনি শিশুর মত অঘোরে ঘুমাতেন। কখনও কখনও মধ্যরাতে উঠে বিস্কুট আর চা খাওয়ার বায়না ধরতেন এবং খেয়েই ছাড়তেন।

একদিন ভোরবেলা দেখি, মোনাজাতভাই পাশে নেই। ফিরলেন সকাল ৭টার দিকে। আমি তো চিন্তায় অস্থির। বললেন, সীমান্তে মুন্সিটারি গিয়েছিলেন ছবি তুলতে। পরে সংবাদে ছাপা হয়েছিল হাতীবান্ধা সীমান্তে মোনাজাতউদ্দিনের তোলা গরু পাচারের দৃশ্য। একদিন হাতীবান্ধার উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব মোতাহার হোসেন (পরবর্তীতে এমপি ও প্রতিমন্ত্রী) আমার বাড়িতে এলেন মোনাজাতভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে। জনাব মোতাহার ওঁকে অনুরোধ করলেন, পারুলিয়ায় নদী ভাঙনের নিউজ করতে। ওঁ একটু ক্ষেপে বললেন, তিস্তা ভাঙছে তো আমি কী করবো? আমি নিউজ করলে সরকারের বরাদ্দ আসবে আর আপনারা লুটপাট করে খাবেন, এই তো? কিছুক্ষণ পর বললেন, ঠিক আছে কিবরিয়াকে পাঠাচ্ছি। আমার নাম শুনে বোঝা গেল জনাব মোতাহার হোসেন খুশি হতে পারলেন না। মোনাজাতভাই বুঝতে পেরে মুচকি হাসলেন। বললেন, মোতাহার সাহেব মন খারাপ করছেন? আরে আপনার ছাত্র কিবরিয়া তো আর সেই কিবরিয়া নেই। ইংরাজিতে বললেন, ’কিবরিয়া ইজ গোয়িং টু বি দ্যা নেক্সট মোনাজাতউদ্দিন।’

পরদিন মোনাজাতভাইয়ের ইয়াসিকা-থার্টি ক্যামেরা ঘাড়ে নিয়ে কাঁচা সড়ক ধরে এলাম হাতীবান্ধায়। আমার স্কুল জীবনের শিক্ষক উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন ওঁর সিডি-এইট্টি মোটর সাইকেল আমাকে দিলেন। আমি গেলাম হাতীবান্ধা থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে পারুলিয়ায়। তথ্য ও ছবি নিয়ে বাড়ি ফেরার পর খুব খুশি হলেন মোনাজাতভাই। হেসে বললেন, সব তথ্য একদম ঠিক ঠিক নিয়ে এসেছ। পরে সংবাদে টানা ৩ দিন ছাপা হয়েছিল পারুলিয়ার ভাঙনের খবর আর দূর্ভোগের নানা দৃশ্য। ছাপা হয়েছিল যে, ভাতের সংস্থান করতে না পারায় এক হতভাগা ভাতের হাঁড়ি বিক্রি করে চাল কিনেছে। হাতীবান্ধার বাল্যবিবাবাহ, বহুবিবাহ সম্পর্কে একাধিক সচিত্র প্রতিবেদন করেছিলেন মোনাজাতউদ্দিন। আমার ধারণা, সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনই তাঁর লেখায় নিরক্ষরতা, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রথম সুত্রপাত ঘটিয়েছেন এদেশে।

রংপুরে ফেরার দিন ট্রেনে পাশাপাশি বসা দু’জনে কত কী গল্প করেছি আজ আর সেসব মনে নেই। মনে আছে, মোনাজাতভাই আমাকে বলেছিলেন, ’কিবরিয়া, ভাল সাংবাদিক হতে চাইলে দুটি কাজ কখনও করো না। রাজনীতি আর প্রেসক্লাব। প্রেসক্লাবের নেতা হতে যেও না। আর একটা কথা, মোতাহার সাহেব তোমার স্কুল জীবনের শিক্ষক। তাঁকে সম্মান করবে ঠিকই কিন্তু ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে মিশতে যেও না। মোতাহার স্যার সম্পর্কে মোনাজাতভাইয়ের সেদিনের নেতিবাচক মন্তব্য আমাকে আহত করেছিল। হয়তো রাজনীতির বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে মোনাজাতভাই অমন করে আমাকে সেদিন বলেছিলেন। কিন্তু আজ এতোদিন পর একথা স্বীকার করি যে, জীবনের সিঁড়ি বেয়ে আমি উপরে উঠতে পারিনি বরং বহুবার বহুভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ছিটকে পড়েছি। ধাক্কা খেতে খেতে আজও পাটাতনেই পড়ে আছি। পড়ে আছি দীক্ষাগুরু মোনাজাতউদ্দিনের কথাগুলো না মানার কারণেই। হে দীক্ষাগুরু, হে পিতা, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আপনার ছোটো মেয়ে সিথি আমার খুব ভক্ত ছিল, আমিও আদর করতাম খুব, আপনি জানতেন, দেখেছেন। এখন স্বামী সংসার নিয়ে কানাডায় আছে আপনার আদরের সিথি। আমার দ্বিতীয় সন্তানের নাম রেখেছি ওর নামেই- ‘সিথি’। সিথি কিবরিয়া।

রংপুর বেতারে সংবাদপাঠক হিসেবে ১৯৮৩-র মার্চে যোগ দিই। ৩০ বছর পর সংবাদপাঠকের জীবন থেকে ২০১৩-র জুলাইতে সরে এসে বেতার সাংবাদিকের দায়িত্বে আছি হাতীবান্ধা-পাটগ্রামের। মোনাজাতভাই রংপুরে থাকলে আমার কন্ঠে সংবাদপাঠ শুনতেন। কোনো উচ্চারণের ভুল ওঁর কান এড়িয়ে যেতো না। পরে ধরিয়ে দিতেন। কয়েক বছর পর সংবাদপাঠের পাশাপাশি ইচ্ছা হলো অনুবাদক হিসেবেও কাজ করি। ইতস্তত করে মোনাজাতভাইকে বললাম, আপনি যদি বার্তানিয়ন্ত্রক রায়হানউদ্দিন সাহেবকে বলেন তাহলে কাজটা হয়ে যায়। খানিক রেগে বললেন, ’তুমি তো জানো যে আমি কারও জন্য তদবির করি না।’ থেমে গেলাম। পরদিন দুপুরে রংপুর বেতারের বার্তাকক্ষে কাজে আছি। হঠাৎ মোনাজাতভাই এসে হাজির। রায়হানভাই মোনাজাতভাইকে সম্মান জানিয়ে হাত ধরে বসালেন। কথার এক ফাঁকে মোনাজাতভাই রায়হানভাইকে বললেন, শুনলাম সংবাদ অনুবাদক নিচ্ছেন। কিবরিয়াকে চুক্তিপত্র দিয়ে দেন। ও অনেকের চেয়ে ভালো করবে। রায়হান ভাই তাকালেন মোনাজাতভাইয়ের দিকে। মোনাজাতভাই তখন ইংরাজিতে বললেন, ’রিমেম্বার, কিবরিয়া ইজ দ্যা প্রডাক্ট অফ মোনাজাতউদ্দিন।’ পরদিন থেকে রংপুর বেতারে চুক্তিবদ্ধ হয়ে গেলাম অনুবাদক হিসেবে।

পায়রাবন্দ, চিলমারী, বদরগঞ্জ, ডোমার সহ সংবাদ সংগ্রহ করতে মোনাজাতউদ্দিনের নির্দেশে কতো জায়গায় গেছি। কখনও পেয়েছি পুরস্কার কখনও বা তিরষ্কার। সমাজের বঞ্চিত নিপীড়িতদের জন্য ওঁর ছিল এক বুক মমতা আর প্রতিবাদ। ওই প্রতিবাদ তিনি প্রতিফলিত করতেন সংবাদ প্রতিবেদনে। ঘটে যাওয়া ঘটনার নেপথ্য সংবাদ তুলে আনাই ছিল মোনাজাতউদ্দিনের ব্রত। পাশে বসে সংবাদ প্রতিবেদন লিখে ওঁর কাছে সংশোধন করে নিতাম। বিরক্ত হতেন না কখনও, বরং খুশি হতেন মোনাজাতভাই।

দীক্ষাগুরু মোনাজাতউদ্দিন মারা যাওয়ার পর নিজেকে আজও অসহায় মনে হয়। মনে হয়, চলার পথের যা কিছু ভুল তা হয়তো কমই হতো যদি মোনাজাতভাই আজ বেঁচে থাকতেন। আমরা ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেও ওঁর ধারেকাছেও যেতে পারছি না। তখন না ছিল মোবাইল, না ছিল ডিজিটাল ক্যামেরা, কম্পিউটার, অনলাইন সুযোগ। অথচ ওঁ সবসময়ই তরতাজা নিউজ করতেন। নিউজের ব্যাপারে মোনাজাতভাই ছিলেন খুবই স্বার্থপর, কঠোর পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান আর সততার মূর্ত প্রতীক। নিউজ লেখার পর ছুটে যেতেন কোচস্ট্যাণ্ডে। কীভাবে কার হাতে প্যাকেটটি দিয়ে তিনি তাঁকে অনুরোধ করবেন যেন সেটি দ্রুত বংশাল রোডে সংবাদ অফিসে পৌঁছে দেন ওই ভদ্রলোক।

এখন মাঝেমধ্যে রংপুরে যাই। রংপুরে গেলে কষ্ট বাড়ে। জাহাজকোম্পানি মোড় থেকে কতোদিন ধাপ লালকুঠি দু’জনে রিক্সায় চেপে যাতায়াত করেছি। নৃপেনের চায়ের দোকান, সিঙ্গারা হাউস, মিতালি রেস্টুরেন্ট এসব দোকানে ঢুকলে মোনাজাতভাইয়ের ছায়া আজও দেখি। চাপা কষ্টে ভুগি। আগের সেই প্রেসক্লাব ভবন নেই, ওখানে গড়ে উঠেছে আধুনিক প্রেসক্লাব ভবন। সেই স্মৃতিবিজড়িত রুচিতা নামের চায়ের দোকানটি আজ নেই। সবকিছু দেখে তীব্র কষ্টে ভুগি। বিশেষ করে জাহাজকোম্পানি মোড়ে গেলে মনে হয় মোনাজাতউদ্দিন সামনেই হাঁটছেন। খুব খুব কষ্ট পাই। ভাবি, মোনাজাতভাই বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স কত হতো? সত্তর? মোনাজাত ভাই আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন ১৫ বছর ৩ মাস ১৫ দিনের। মোনাজাতউদ্দিন জন্মেছেন ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুন, ১৩৫২ বঙ্গাব্দের ১৩ আষাঢ়, বুধবার। অবশ্য সার্টিফিকেটে তাঁর জন্মতারিখ উল্লেখ আছে ১৮ জানুয়ারি ১৯৪৭। আমার জন্ম ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ১২ অক্টোবর, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দের ২৬ আশ্বিন, বুধবার। বুধবার বুধবার মিল আছে। বয়সের গাণিতিক হিসেবে ওঁ আমার চেয়ে ১৫ বছরের বড় হলেও কর্মে-গুণে মোনাজাতউদ্দিন ছিলেন আমার চেয়ে কোটি কোটি গুণ বড়, বড় মাপের মানুষ মোনাজাতউদ্দিন। কাজপাগল মোনাজাতউদ্দিন বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই এতদিনে ততোটা বুড়িয়ে যেতেন না। আমাকে বলতেন, যারা কাজ করেন তারা বুড়ো হন না, মরেনও না।

লালকুঠি মোড় থেকে ধাপ চারতলা মসজিদ পর্যন্ত সড়কটির নাম রাখা হয়েছে ’মোনাজাতউদ্দিন সড়ক’। নামফলকটি ছোট্ট ও জরাজীর্ণ। সড়কটি পাকা হলেও এবড়োখেবড়ো। কষ্ট পাই। সিটি কর্পোরেশনের তখনকার মেয়র শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর সঙ্গে মোনাজাতউদ্দিনের সুসম্পর্ক ছিল। তাঁর উদ্যোগে জাহাজকোম্পানি মোড়ের নাম হতে পারতো ’মোনাজাতউদ্দিন চত্বর’। সরকারি উদ্যোগে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাম বদলে ’মোনাজাতউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’ হতে পারে। কতোদিনে আমার এসব স্বপ্ন পূরণ হবে জানি না। কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন জড়িয়ে ছিলাম দৈনিক সংবাদে। জড়িয়ে ছিলাম মোনাজাতভাইয়ের জন্যেই। রংপুরে গেলে মুন্সিপাড়া কবরস্থানে মোনাজাতউদ্দিনের পাশে যাই। দোয়াদরুদ পড়ি। মনে মনে বলি, মোনাজাতভাই, আপনি তো আমার কাছ থেকে আজও খুব একটা দূরে নন! আছেন মাত্র একনিশ্বাস দূরে! নিয়তির খেয়ালে আপনার কাছাকাছি আমার আসতেই বা কতোক্ষণ!
—-
সংযোজন- মোনাজাতউদ্দিনের বাবা আলিমউদ্দিন আহমদ ১৯৩৬ সালে কাকিনা মহিমারঞ্জন হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। মোনাজাতউদ্দিনরা ছয় ভাই। মোনাজাতউদ্দিন, মহসিনউদ্দিন, মুজাহিদউদ্দিন, মোখলেসউদ্দিন, মোসাদ্দেকউদ্দিন ও মোরশেদউদ্দিন। লেখক মোখলেসউদ্দিন ১৯৯৬খ্রিস্টাব্দে লণ্ডনে মারা যান। মোনাজাতউদ্দিনের একমাত্র ছেলে বুয়েটের মেধাবি ছাত্র সুবর্ণ মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যুর পর সেও অনন্তলোকে চলে গেছে। দুই মেয়েই ডাক্তার। চৈতি ঢাকায় চাকরি করছে আর ছোটো মেয়ে সিথি এখন কানাডা প্রবাসী। মোনাজাতউদ্দিনের প্রিয়তমা সহধর্মিণী নাসিমা মোনাজাত ইতি সকলের ভালোবাসায় আছেন, তবে কিছুটা অসুস্থ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Right Menu Icon