August 9, 2022, 10:43 am

আসলে কি ছিল নুসরাতের কলঙ্ক? যা বলেছিল অধ্যক্ষ!

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১১, ২০১৯,
  • 0 Time View

বিজয় ডেস্ক: ‘মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না, আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নিবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো। ইনশাআল্লাহ।’

না, বাঁচানো গেলো না নুসরাত জাহান রাফিকে। অধ্যক্ষের যৌন হয়রানির শিকার হয়ে বান্ধবীদের উদ্দেশ্যে এমন চিঠি লিখে গেলেও শেষ পর্যন্ত কথা রাখতে পারেনি নুসরাত। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বুধবার (১১ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯ টার দিকে না ফেরার দেশে চলে গেছেন তিনি।

এদিকে নুসরাতের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার পার না হতেই সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওটি নুসরাতের মারা যাওয়ার আগে সোনাগাজী থানায় রেকর্ড করা হয়েছিল। নুসরাত সে সময় তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন।

ভিডিওটিতে দেখা যায় নুসরাত বলছিলেন, অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তাকে তার জীবনের একটি কলঙ্ক নিয়ে কথা বলত। তবে কি ছিল নুসরাতের জীবনের সেই কলঙ্ক?

জানা যায়, দু’বছর আগে ২০১৭ সালে দাখিল পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে ছাত্রীটির গায়ে চুনমিশ্রিত গরম পানি ছুড়ে মেরেছিল দুর্বৃত্তরা। এতে তার চোখ ও মুখ দগ্ধ হয়েছিল।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ছাত্রীটি সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেও এ ঘটনাকে পুঁজি করে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তাকে নিপীড়ন করত।

এ ঘটনাকে পুঁজি করে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তাকে বলত, ‘ওটা তো তোর লাইফে কলঙ্ক হয়ে গেছে। তোকে আর কেউ বিশ্বাস করবে না। তোর লাইফে তো আগে একটা কলঙ্ক আছে। তুই আমার সঙ্গে থাক।’

জবানবন্দিতে ছাত্রীটি আরও বলেন, ‘আমার একটা অ্যাকসিডেন্ট হইছে, কেউ একজন আমাকে চুন মারছে। চুনগুলো আমার চোখে পড়ছিল। সেটা নিয়ে নিউজ হইছিল। উনিও ওইটার সুযোগ নিছেন।’

ছাত্রীর স্বজনদের অভিযোগ, অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগের জেরে শনিবার আলিম পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে ছাত্রীটিকে আগুনে ঝলসে দেয়া হয়েছে। তারা জানান, ছাত্রীটি তাদের জানিয়েছেন চুন নিক্ষেপের ঘটনার দুর্বলতাকে পুঁজি করেই অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তাকে যৌন হয়রানি করত।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দাখিল পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার পথে ছাত্রীটি হামলার শিকার হন। সোনাগাজী উপজেলার কাশ্মীর বাজার সড়কের সিদ্দিক বাড়ির সামনে পৌঁছলে ওতপেতে থাকা দুর্বৃত্তরা পাশের দেয়ালের অপর পাশ থেকে চুন মেশানো গরম পানি ছাত্রীটির গায়ে নিক্ষেপ করে। এতে তার চোখ ও মুখ ঝলসে যায়।

তাকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে ফেনী সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে তাকে পাঠানো হয়। সেখান থেকে সুস্থ হয়ে তিনি বাড়িতে ফেরেন। তার স্বজনরা জানান, এ ব্যাপারে থানায় জিডি করা হয়।

সন্দেহভাজন এক নারীকেও আটক করে পুলিশ। কিন্তু দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করা যায়নি। এ ঘটনার পর বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও উঠে আসে। তার চাচাতো ভাই বলেন, গরম পানি নিক্ষেপের ঘটনাকে দুর্বলতা হিসেবে নিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা ছাত্রীটিকে যৌন হয়রানি করত।

বাবার বয়সী ব্যক্তির যৌন হয়রানিতে অতিষ্ঠ হয়ে ২৭ মার্চ মুখ খোলেন ওই ছাত্রী। এর জেরে ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতর ওই ছাত্রীর (১৮) গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। শনিবার সকালে সোনাগাজী পৌর এলাকার ইসলামিয়া সিনিয়ার ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রী ওই মাদ্রাসা থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে কয়েকজন বোরকাপরা নারী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা। তারা জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ তথ্য ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছেন ওই শিক্ষার্থী। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এদিন বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে অধ্যক্ষ তার অফিসের পিয়ন নূরুল আমিনের মাধ্যমে ছাত্রীকে ডেকে নেন। পরীক্ষার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন অধ্যক্ষ। পরে পরিবারের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হন অধ্যক্ষ। সেই মামলা তুলে না নেয়ায় অধ্যক্ষের লোকজন ওই ছাত্রীর গায়ে আগুন দিয়েছে।

এর আগে ঢামেক হাসপাতাল মর্গে নুসরাতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে মরদেহ তার পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, বড় আকারে দগ্ধ হওয়ার কারণেই নুসরাতের মৃত্যু হয়েছে।

গত ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রে গেলে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে পালিয়ে যায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। এর আগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে করা যৌন হয়রানির মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতকে চাপ দেয় তারা।

পরে আগুনে ঝলসে যাওয়া নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার চিকিৎসায় গঠিত হয় ৯ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড। সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উন্নত চিকিৎসার জন্য নুসরাতকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোরও পরামর্শ দেন তিনি। কিন্তু সবার প্রার্থনা-চেষ্টাকে বিফল করে বুধবার (১০ এপ্রিল) রাতে মারা যায় ‘প্রতিবাদী’ নুসরাত।

এ ছাত্রীর পরিবারের অভিযোগ, ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা তার কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। তারই জেরে মামলা করায় নুসরাতকে আগুনে পোড়ানো হয়। শ্লীলতাহানির ওই মামলার পর সিরাজ উদ-দৌলাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

আগুনে পোড়ানোর ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাকে সাত দিনের এবং ওই মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবছার উদ্দিন, নুসরাতের সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নুর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন ও শাহিদুল ইসলামকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডে পাঠান আদালত। বৃহস্পতিবার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি এবং এজহারনামীয় মাদ্রাসাছাত্র জোবায়ের আহমেদকেও পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category
© All rights reserved © 2019 LatestNews
themesbanewsbijo41