ভারতে নারী এমপির বক্তব্যে সরগরম সামাজিক মাধ্যম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতীয় লোকসভায় প্রথমবারের মতো এমপি হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস পার্টির মহুয়া মৈত্র। মঙ্গলবার পার্লামেন্টে প্রথম ভাষণে তিনি ফ্যাসিবাদ বা কর্তৃত্ববাদী জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক লক্ষণগুলো নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, ভারতের সামাজিক মাধ্যমে সেটাকে ‘বছরের সেরা’ ভাষণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বহু মানুষ।

বিরোধী এমপি মহুয়া মৈত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে একটি পোস্টারে তিনি ফ্যাসিবাদের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর এক তালিকা দেখেছিলেন।

তালিকার সে সব লক্ষণ তিনি একে একে পড়ে শুনিয়ে বলছিলেন, ভারতের সংবিধান এখন হুমকির মুখে, এবং দেশটির ক্ষমতাসীন দলের ‘বিভক্তির রাজনীতি’র কারণে ভারত এখন ‘ছিঁড়ে টুকরো’ হয়ে যাচ্ছে।

মৈত্র শুরুতেই ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপির বিজয়ের উল্লেখ করে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন।

সাত মাস ধরে হওয়া নির্বাচনের ফল আসে মে মাসের শেষ দিকে, তাতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হয়।

মৈত্র বলেন, এখন এ বিপুল জয়ের একটি প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের স্বর যাতে ‘অশ্রুত’ থাকে তা নিশ্চিত করা।

মঙ্গলবার পার্লমেন্টে প্রথমবারের মতো বক্তব্য রাখতে যখন মৈত্র উঠে দাঁড়ান, কিছুক্ষণের মধ্যেই সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা তিরষ্কার ধ্বনি দিতে শুরু করেন। তার মধ্যেই মৈত্র ফ্যাসিবাদের সাতটি প্রাথমিক লক্ষণ পড়ে শোনান-

১. দেশে শক্তিশালী ও ধারাবাহিক জাতীয়তাবাদ ক্রমে দেশের জাতীয় পরিচয়ে পরিণত হয়। এটা ‘সুপারফিশিয়াল’ বা এর আসলে কোনো গভীরতা নেই বলে মৈত্র মন্তব্য করেন।
‘এটা বর্ণবাদ এবং সংকীর্ণ ভাবনা। এটা বিভক্তি বাড়ায় আর কোনোভাবেই ঐক্যের চেষ্টা করে না।’

২. মিস মৈত্র উল্লেখ করেন যে ‘মানবাধিকারের প্রতি একটি ব্যাপক অবজ্ঞা’ দেখা যাচ্ছে, যা ২০১৪ থেকে ২০১৯ এর মধ্যে অন্তত ১০ গুণ বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

৩. গণমাধ্যমের ওপর কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণের কড়া সমালোচনা করেন মৈত্র।

তিনি বলেন, ভারতের টিভি চ্যানেলগুলো নিজেদের এয়ারটাইমের বড় অংশ ক্ষমতাসীন দলের প্রচার-প্রোপাগান্ডায় ব্যয় করেছে।

৪. জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বাড়তি সচেতনতার জন্য সরকারকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ভারতে এক ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে এবং প্রতি নিয়ত নতুন শত্রু তৈরি করা হচ্ছে।

৫. সরকার ও ধর্ম পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এ সম্পর্কে কি আমার বলবার প্রয়োজন আছে? আমার কী বলার প্রয়োজন আছে যে নাগরিক হওয়ার মানে কী সেটাই আমরা বদলে দিয়েছি?

তিনি উল্লেখ করেন মুসলমানদের টার্গেট করে আইনে সংশোধন আনা হয়েছে।

৬. বুদ্ধিজীবী ও শিল্পের প্রতি চরম অবজ্ঞা দেখানো হয়েছে, এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর শোষণ চালানো হয়েছে।

একে ফ্যাসিবাদের সব চিহ্নের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর বলে মৈত্র মন্তব্য করেছেন। ‘এটা ভারতকে অন্ধকার যুগে নিয়ে গেছে।’

৭. দেশটির নির্বাচন ব্যবস্থার স্বাধীনতা নষ্ট হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, একে ফ্যাসিবাদের শেষ চিহ্ন হিসেবে উল্লেখ করেন।

কে এই মহুয়া মৈত্র
জেপি মর্গানের সাবেক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার মিস মৈত্র, রাজনীতি করবেন বলে ২০০৯ সালে লন্ডনে নিজের চাকরিতে ইস্তফা দেন। কয়েক বছর ধরে তিনি তৃনমূল কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছিলেন এবং নিয়মিত টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নিতেন। সর্বশেষ নির্বাচনের সময় পশ্চিম বাংলায় কৃষ্ণনগরের প্রত্যন্ত গ্রামে তার প্রচারে দলের সঙ্গে বিবিসি সঙ্গে টানা দুই দিন কাটায়।

তৃণমূল কংগ্রেস সেখানে ক্ষমতায়। সেখানে সব বক্তৃতায় মোদি কে আক্রমণ করে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন তিনি। কাশ্মীরে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলা এবং পাকিস্তানে চালানো ভারতের বিমান হামলার সমালোচনা করেন তিনি। ওই ঘটনাগুলোয় বিজেপি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা চালায় বলে তিনি কঠিন সমালোচনা করেন।

পুরো সময়টা ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা হট্টগোল করে তাকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাতে তাকে একবারো বিচলিত হতে দেখা যায়নি। বরং তিনি দৃঢ়ভাবে দাড়িয়ে নিজের বক্তব্য শেষ করেন।

এ সময় কয়েকবারই তিনি স্পিকারকে তার ‘পেশাগত দায়িত্ব’ পালনের আহ্বান জানাতে থাকেন।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে মমতার দুর্গ দখল করতে না পারলেও বড় ফাটল ধরিয়েছে বিজেপি। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের এক মাস পর পশ্চিম বঙ্গে বিজেপির কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত হয়েছেন।

মহুয়া মৈত্রের বক্তব্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
নানা তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে ১০ মিনিট ধরে ইংরেজিতে বক্তব্য রাখেন মৈত্র, মাঝখানে হিন্দিতে কয়েক ছত্র কবিতাও উদ্ধৃতি দেন তিনি।

সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই এ হিন্দি কবিতা আওড়ানোর জন্য তার ভূয়সী প্রশংসা করেন, কারণ তিনি হিন্দিভাষী নন। তার মাতৃভাষা বাংলা।

ফলে মঙ্গলবার তিনি যখন প্রথমবারের মতো ভাষণ দিতে দাঁড়ান, অনেকেই একটি বুদ্ধিদীপ্ত বক্তৃতাই আশা করেছিল। কিন্তু অনেকের কাছেই এটা ছিল ‘বুদ্ধিদীপ্ত’র চেয়ে বেশি কিছু।

কিছুক্ষণের মধ্যেই টুইটারে এ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা।

মৈত্রীর এই ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কারণ দেশটির পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীন বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ, এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দল কোণঠাসা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে ভারতের রাজনীতি এখনো অনেক বেশি পিতৃতান্ত্রিক।

ভারতের রাজনীতিতে এখনো নারীর সংখ্যা কম, বিশেষ করে হাউসে নারীর সংখ্যা মাত্র ১৪ শতাংশ। এর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক নারীই জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন, বাকিরা নীরবই থাকেন।

মহুয়া মৈত্রের এ শক্তিশালী ভাষণ অন্য নারী এমপিদের উৎসাহিত করবে এমনটাই আশা করছেন অনেকে।

ক্ষমতায় আসার পর থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমে দুর্বল করে দেওয়ার অভিযোগ তোলা হচ্ছে বিজেপির বিরুদ্ধে। তবে সে অভিযোগ সব সময়ই অস্বীকার করে এসেছে বিজেপি। কিন্তু কেবল রাজনৈতিক দলই নয়, বিভিন্ন মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠনও বিজেপির বিরুদ্ধে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানের নামে ভারতের ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ধূলিসাৎ করা হচ্ছে এমন অভিযোগ করে আসছে।

বুধবার বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মৈত্রী বলেন, ‘পার্লামেন্টে আমরা যেহেতু বিরোধী দল, আমাদের বেশি বেশি নানা ইস্যুতে কথা বলতে হবে। সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে আমাদের কথা বলতে হবে, ঘাটতিগুলো দেখিয়ে দিতে হবে। এটাই আমার দায়িত্ব এবং আমার সবোর্চ্চ সামর্থ্য দিয়ে আমি সেটা করে যাব।’
খবর বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Right Menu Icon