সাহিত্য ও বিজ্ঞান

নিশাত হোসেন: সাহিত্য ও বিজ্ঞান দুটোই মানুষের অত্যন্ত প্রয়োজন কিন্তু সাধনা ভিন্ন। সাহিত্য হলো যে কথাগুলো মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয় অর্থাৎ মানুষের সুখ-দুঃখ ভালো-মন্দ ইত্যাদি সম্বন্ধে বলা বা লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করাই সাহিত্য। যিনি সাহিত্য চর্চা করেন তাকে বলা হয় সাহিত্যিক। অপর দিকে বিজ্ঞান হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পদ্ধতিগতভাবে সঠিক রহস্য উদঘাটন এবং সত্যতা প্রমাণ করাই বিজ্ঞান। যিনি বিজ্ঞানের গবেষণায় সঠিক তথ্য এবং তত্ত্ব দেন তিনি হলেন বিজ্ঞানী।

মানুষের জীবনে বিজ্ঞানের যেমনি প্রয়োজন সাহিত্যেরও প্রয়োজন তেমনি। এমন একসময় ছিল যখন বর্তমানে ব্যবহৃত বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি আবিষ্কার হয়নি যেমন বৈদ্যুতিক লাইট, ফ্যান, টেলিভিশন, রেডিও, রেফ্রিজারেটর, অডিও, ভিডিও, যান্ত্রিক পরিবহন, নৌযান, উড়োজাহাজ, টেলেক্স, ফ্যাক্স, কম্পিউটার, ঘড়ি, মোবাইল ইত্যাদি। কিন্তু তখনো মানুষের জীবনযাত্রা থেমে থাকেনি। তখনো প্রবাহ ধারার মতো চলমান ছিল সাহিত্য চর্চা। তবে এখনকার মতো পঠন পাঠনের মাধ্যমে না হলেও মুখে মুখে কবিতা, ছড়া, শ্লোক, গীত গেয়ে মানুষ মানুষকে আনন্দ দিতো কিংবা সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দের কথা তুলে ধরত। বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞানের যতটা অগ্রসর হয়েছে সাহিত্যেও সমৃদ্ধি হয়েছে তদরূপ। এই সময়ে বিজ্ঞান ছাড়া যেমনি কেউ এক মুহূর্ত চলতে পারে না। তেমনি সাহিত্য ছাড়াও জীবনকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সাহিত্যের শাখায় একজন কবির কবিতার কথাই ধরা যাক। তিনি স্বপ্নদ্রষ্টা অর্থাৎ তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করে অপরূপ পরিবেশের ধারা পর্যবেক্ষণ করে মানুষকে স্বপ্ন দেখান। মানুষের মনকে সতেজ সুষমামণ্ডিত করেন। সমাজ এবং দেশকে প্রগতিশীল করায় রত থাকেন। যদিও কোনো কোনো সময় তিনি কল্পনা করেন দেশের অগ্রগতি সুখশান্তিতে সকলের বসবাস। বাস্তবের সাথে যার মিল না থাকলেও তার লেখায় চমৎকার চিত্রকল্প ফুটে ওঠে। তিনি সব সময় মন্দকে ঘুচিয়ে ভালোকে গ্রহণ অন্যায়কে নির্মূল করে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে রত থাকেন এবং মানুষের মনমানসিকতার উৎকর্ষ সাধন করেন। অন্যদিকে বিজ্ঞানের গবেষণায় জগতে যা কিছু ঘটে বিজ্ঞানী তার আগাগোড়া পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাইয়ের চেষ্টা করেন। কিভাবে এটা হলো ওটা কেন হলো না? কিভাবে ওটা হলো এটা কেন হলো না কেমনে সমস্যার সমাধান হবে বা লাঘব করা যাবে কী করলে। কাজকর্ম দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হবে ইত্যাদি বিষয়ে বিজ্ঞানীর চিন্তার অন্ত নাই। বিজ্ঞানের গবেষণায় বিজ্ঞানীর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে মানুষ এত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে শিখেছে। পৃথিবীতে কিংবা পৃথিবীর বাইরে যা-ই ঘটুক এর সঠিক রহস্য বিজ্ঞানীই অনুসন্ধান করেন। অতএব বোঝা যাচ্ছে আধুনিক পৃথিবীতে বিজ্ঞানের অবদান অপরিসীম। তবে কবির লেখায় যে সব অবাস্তব বর্ণনা থাকে তা কবির কল্পনা থেকেই উৎপত্তি। এসবের মধ্যে বিজ্ঞানী তার রহস্য খোঁজেন বাস্তবের সাথে এর কতটুকু মিল রয়েছে। কোনো কোনো সময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে মিল পেয়েও যান। অনেক সময় লেখকদের লেখায় বিজ্ঞানীরা উদ্বুদ্ধ হন। আবার তদরূপ বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার এবং তাদের দেয়া রহস্যের সূত্রে বা তত্ত্বে লেখকদের লেখাও সমৃদ্ধ হয়েছে। এতে লেখকেরা যথেষ্ট প্রগতিশীল হয়ে উঠেছেন। সাধারণত কবি হতে চাইলে অবশ্যই তাকে কিছু কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে। কিন্তু বিজ্ঞানী হতে চাইলে সব সময় তাকে সচেষ্ট থাকতে হবে পদ্ধতিগতভাবে সত্য উৎঘাটনের কিংবা যাচাইকৃত কোনো কিছু আবিষ্কারের।

সাহিত্য শাখায় গল্প হলো জীবনের একটি পরিসরে কিছু বলা। উপন্যাস হলো জীবনের বৃহৎ পরিসরে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা। কবিতা হলো সুন্দর সুন্দর শব্দচয়নে ছন্দবদ্ধ বাক্যে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা। ছড়া হলো এক বাক্যের সাথে আরেক বাক্যের সঠিক অন্ত্যমিলে ছন্দবদ্ধভাবে কিছু বলা এবং প্রবন্ধ হলো নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আলোচনা করা সেটা হতে পারে সাহিত্য হতে পারে বিজ্ঞান। আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে সাহিত্যের সাথে বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নাই। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে অনেক ক্ষেত্রেই আছে। উদাহরণস্বরূপ কবি সাহিত্যিকেরা পাখি নিয়ে অনেক কল্পনা করে কবিতা ছড়া লিখেছেন- ‘আমি যদি পাখি হতাম, বহু দূর উড়ে যেতাম।’ মানুষ পাখি হতে পারেনি ঠিকই তবে বিজ্ঞানীদের প্রবল সাধনায় মানুষ বিমানে চড়ে আকাশে উড়ে পাহাড়-পর্বত নদী-সমুদ্র গিরি অরণ্য পেরিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে অবস্থান করেছে। লেখকেরা চাঁদ নিয়েও অনেক লিখেছে- আমি চাঁদের দেশে যাবো, আনন্দে ঘুরে বেড়াবো। বিজ্ঞানের অসাধ্য প্রচেষ্টায় মানুষ সত্যিই চাঁদে যেতে পেরেছে কবির জল্পনা কল্পনা থেকেই বিজ্ঞানী এ ধরনের অনেক রহস্য উদঘাটন করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। বর্তমানে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বিজ্ঞানের অবদান অতুলনীয় এবং এর গুরুত্ব অপরিসীম। ঠিক তেমনি বিজ্ঞানের আবিষ্কার বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমস্যা সমাধান ইত্যাদি সম্বন্ধে সুন্দর সুন্দর শব্দচয়নে বাক্যবিন্যাসে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে সাহিত্য। দিন দিন বিজ্ঞান যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে সাহিত্যের ভাণ্ডারও সেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানের যুগে মানুষের জীবনপ্রণালীর কথা তুলে ধরা হয়েছে সাহিত্যে। বিজ্ঞান চর্চা করা যেমনি কঠিন অর্থাৎ প্রচুর অধ্যবসায় করতে হয় সাহিত্য চর্চায়ও তেমনি অধ্যবসায় প্রয়োজন। শুধু বিজ্ঞান ও সাহিত্যেই নয় যেকোনো কাজে কৃতকার্য হতে চাইলে প্রচুর পরিশ্রম ও সময় ব্যয় করতে হয়। অতএব বোঝা যাচ্ছে বিজ্ঞান ছাড়া জীবন অচল হলে সাহিত্য ছাড়াও জীবন সচল নয়। মানুষের জীবনে বিজ্ঞান যেমনি গুরুত্বপূর্ণ তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Right Menu Icon