হাতীবান্ধায় যৌননিপীড়ন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আলী আখতার গোলাম কিবরিয়ার ‘আঠালাগার বাজার’

Ali Akhtar Golam Kibria

আঠালাগার বাজার:
যৌননিপীড়নের অভিযোগে হাতীবান্ধার এক প্রধান শিক্ষককে

ফাঁসানোর চক্রান্ত।

শিক্ষক কর্তৃক যৌননিপীড়নের কথা শুনলে আমরা এমন কেউ কেউ আছি যারা প্রথমেই বিশ্বাস করে ফেলি। কিন্তু পাশাপাশি এটাও ভাবা দরকার যে, ঘটনাটি সত্য হতে পারে বা সত্য না-ও হতে পারে। যৌননিপীড়নের নামে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে হেনস্থা করার চক্রান্ত কি না, সেটাও ভাবার সময় এসেছে। কারণ সম্প্রতি চারদিকে যৌননিপীড়ন অভিযোগের ঢেউ লেগেছে। কোনটা সত্য, কোনটা সত্য নয়, তাৎক্ষণিকভাবে বলা মুশকিল। সেজন্য বলি, অভিযোগ উঠলে সেটা সত্য হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে চোখ-কান বন্ধ করে অভিযুক্ত শিক্ষকের ফাঁসি চাইতে হবে তা তো নয়। দেশে আইন আছে, তদন্ত আছে, বিচারের জন্য আদালত আছে। একটু ধীরে চলি না কেন! আমরা তো আর হাওয়ার উপরে বসবাস করছি না। আমাদের পায়ের নিচে এখনও মাটি আছে। ভালো করে খতিয়ে দেখি, সত্যি সত্যি যৌননিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে, নাকি প্রতিশোধ নিতে কেউ আঠা লাগিয়ে ভেতরে ভেতরে ফায়দা লুটছে।

হাতীবান্ধা সদরের কাছাকাছি দূরত্বে চৌরাস্তার মোড়ে একটি ছোট্ট বাজার আছে। নাম শুনলে হয়তো হাসবেন। বাজারটির নাম হলো ‘আঠালাগার বাজার’। আঠালাগার বাজারের পাশেই রয়েছে ধুবনি সরকারি প্রাইমারি স্কুল। স্কুলটির প্রধানশিক্ষক হচ্ছেন জনাব সুলতান আহমেদ শিপু। সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে যে, প্রধানশিক্ষক শিপু ওই স্কুলের ক্লাস ফাইভের এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করেছেন। এই অভিযোগে স্কুলটির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জনাব মোশারফ হোসেন বিভিন্ন দপ্তরে গত ১৩ই এপ্রিল লিখিতভাবে অভিযোগ করে শিপুর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। এরই মধ্যে অভিযোগের সমর্থনে ছাত্রীটির ভিডিও বক্তব্য নাকি সভাপতির লোকজন ধারণ করেছেন। সেখানে ছাত্রীটি নাকি বলেছে, প্রধানশিক্ষক তাকে হয়রানি করেছে। আর সেই সূত্র ধরে দুই-একটি নিউজ পোর্টালে ইতোমধ্যে খবরও পরিবেশিত হয়েছে বলে শুনেছি।

একইসঙ্গে সামান্য সময়ের ব্যবধানে আরেকটি ভিডিও দেখা গেল, যেখানে ছাত্রীটি ও তার বাবা জানিয়েছেন যে, এরকম ঘটনা আদৌ ঘটেনি। তিনি বলেছেন, তাদের এক আত্মীয় ছাত্রীটির বাবাকে জমি দিতে বাধ্য করার কৌশল হিসেবে মোশারফ হোসেনের মাধ্যমে আঠালাগার এই ফাঁদ পেতেছেন৷ মেয়েটির বাবা বলেন, পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনাটি সাজানো হয়েছে এবং তার পরিবারের মানসম্মান ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। তার মেয়ের কোনো ক্ষতি হলে তিনি ছাড়বেন না। প্রয়োজন হলে তিনি আদালতে যাবেন। ঘটনাটি অবশ্য এখানেই থেমে থাকেনি। ছাত্রীটির বাবা এরই মধ্যে ধুবনি সরকারি প্রাইমারি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বিচার দাবি করেছেন এবং বিভিন্ন দপ্তরে দাখিল করা ওই দরখাস্তে তিনি প্রধানশিক্ষক সুলতান আহমেদ শিপুকে নির্দোষ দেখিয়েছেন।

এককথায়, আঠালাগার বাজারের আঠা এবার ভালোভাবেই লেগে গেছে।

উল্লেখ করা যায়, স্কুলের সভাপতি মোশারফ হোসেন সাহেব সভা করে যে রেজুলেশন দাখিল করেছেন, সেই রেজুলেশনটি সম্পূর্ণ একপেশে ও উদ্দেশ্যমূলক। কারণ ওই সভায় উপস্থিত থাকার জন্য লিখিতভাবে প্রধানশিক্ষককে নোটিস করা হয়নি। রেজুলেশনে প্রধানশিক্ষক সুলতান আহমেদ শিপুর সই নেই। রেজুলেশনে একই আলোচনার বিষয়বস্তুকে চার ভাগে অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। একই রেজুলেশনে দুই ব্যক্তির হাতের লেখা দেখা গেছে। রেজুলেশন দুজন লিখেছেন, কেন লিখেছেন, তা অনুমান করা যাচ্ছে না। লক্ষ্যণীয়, প্রধানশিক্ষককে যৌননিপীড়নের অভিযোগে একটিবারও কৈফিয়ত তলব করা হয়নি। অর্থাৎ প্রধানশিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোনো সুযোগই দেয়া হয়নি। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, যৌননিপীড়নের ঘটনা উল্লেখ করে ছাত্রী বা ছাত্রীটির বাবা স্কুলের সভাপতি মোশারফ হোসেন সাহেবের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ করেছেন এমন তথ্য নেই। যা লেখা হয়েছে, সবই শোনা কথার উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। কথিত যৌননিপীড়নের ব্যাপারে ম্যানেজিং কমিটির গঠন করা কোনো তদন্ত কমিটি বা সাক্ষী বা ভিক্টিমের জবানবন্দি বা শিক্ষার্থীদের বক্তব্যের বিশদ পর্যালোচনার কোনো অস্তিত্ব রেজুলেশনে দেখা যাচ্ছে না।

এই বিষয়গুলোর আলোকে দাখিল করা ম্যানেজিং কমিটির রেজুলেশনে শিক্ষকপ্রতিনিধি হালিমা খাতুনের সই বা তার সমর্থন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি একপেশে এই রেজুলেশনে কীভাবে বা কেন সই করলেন সেটা আরেক প্রশ্ন। আমার বিশ্লেষণে, হালিমা খাতুন সরকারি চাকরি-বিধিলঙ্ঘনের অপরাধ করেছেন বলে মনে হয়। ধরে নেয়া যায় যে, শিক্ষক হালিমা খাতুন সুযোগ বুঝে প্রধানশিক্ষককে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার সুযোগটি কাজে লাগিয়েছেন।

স্কুল এলাকার কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, প্রধানশিক্ষক সুলতান আহমেদ শিপু স্কুলে যোগ দেয়ার পর স্কুলটির পাঠদান আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত হয়েছে। সহকারী শিক্ষকরা আগের মতো আর ক্লাস ফাঁকি দিতে পারেন না। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির হর্তাকর্তারা সরকারি বরাদ্দের টাকা আগের মতো ভাগাভাগি করে খেতেও পারছেন না। এসব ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে সহকারী শিক্ষকগণ ও ম্যানেজিং কমিটির সকল সদস্য সভাপতি মোশারফ হোসেনের নেতৃত্বে প্রধানশিক্ষকের বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছেন। যেহেতু এবার সুযোগ এসেছে, তাই তারা প্রধানশিক্ষক শিপুকে এক হাত দেখে নেবেন। প্রধানশিক্ষক সুলতান আহমেদ শিপুর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনিও এই কথাগুলোর সঙ্গে একমত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ঘটনাটি অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যদিকে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোশারফ হোসেন একটি জাতীয় দৈনিককে বলেছেন, ছাত্রীর বাবা যদি ‘অস্বীকার’ করেন তাহলে তো আমাদের করার কিছু নেই।

একজন শিক্ষক হিসেবে বলবো, এভাবে কথা বলে আপনি পার পেতে পারেন না জনাব মোশারফ হোসেন। অস্বীকার করা আর ‘ঘটনা ঘটেনি’ তো এক কথা নয়। মেয়েটির বাবা যে-ভাষায় অভিযোগ করেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, যৌননিপীড়নের কোনো ঘটনাই সেখানে ঘটেনি। তা ছাড়া আপনার রেজুলেশনের প্রক্রিয়া যথাযথ নয়। আপনি চক্রান্ত করে এই নাটকটি সাজিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়। ছাত্রীর বাবার বক্তব্য আমলে নিলে বলতে হয়, আপনি তাড়াহুড়ো করে চক্রান্তের জাল বুনেছেন। সেই জালে ফেলে আপনি একজন শিক্ষককে হেনস্থা করার ঘৃণ্য পথ বেছে নিয়েছেন। ছাত্রীটির পারিবারকে সামাজিকভাবে হেয় করেছেন। আপনি একটি শিশুশিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার পাশাপাশি স্কুলটির লেখাপড়ার পরিবেশ কলংকিত করার ষড়যন্ত্রে নেমেছেন। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে আপনাকে অবিলম্বে আইন আমলে নেয়া উচিত। কী বলেন মোশারফ হোসেন সাহেব?

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Right Menu Icon